কুরবানি কাদের উপর ফরজ? কুরআন ও হাদিসের সঠিক বিধান
কুরবানি বা 'উযহিয়্যাহ' হলো আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে ঈদুল আজহার নির্দিষ্ট দিনগুলোতে পশু জবাই করার একটি মহান ইবাদত।
কুরবানি কেবল একটি প্রথা নয়, বরং এটি হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ত্যাগের স্মারক এবং আল্লাহভীতির বহিঃপ্রকাশ।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, "অতএব আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কুরবানি করুন" (সুরা আল-কাউসার: ২)।

কুরবানি কি ফরজ নাকি সুন্নাত?
কুরবানির বিধান নিয়ে ইসলামি ফকিহদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।
হানাফী মাজহাব অনুযায়ী, সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলিমের ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব।
ইমাম শাফিঈ ও মালিকী মাজহাবের মতে, এটি সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত।
তবে সব আলেম একমত যে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি ত্যাগ করা উচিত নয়।
রাসুল (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়" (ইবনে মাজাহ)।
কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ
কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তির মধ্যে নিম্নোক্ত শর্তগুলো থাকা আবশ্যক:
কুরবানি কেবল মুসলিমদের জন্য ইবাদত।
পাগল বা অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তির ওপর কুরবানি ওয়াজিব নয়।
অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর ওপর কুরবানি বাধ্যতামূলক নয়, তবে অভিভাবক তাদের পক্ষ থেকে নফল হিসেবে করতে পারেন।
শরয়ী মুসাফির বা ভ্রমণকারীর ওপর কুরবানি ওয়াজিব নয়।
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
আর্থিক সামর্থ্য বা নিসাবের নিয়ম
যদি কারো কাছে ঈদুল আজহার দিনগুলোতে (১০, ১১ ও ১২ জিলহজ) নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তবে তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব।
৫২.৫ তোলা (৬১২.৩৬ গ্রাম) রূপা অথবা ৭.৫ তোলা (৮৭.৪৮ গ্রাম) স্বর্ণের সমমূল্যের সম্পদ।
জাকাতের নিসাবের সাথে এর দুটি বড় পার্থক্য রয়েছে:
- জাকাতের মতো এই সম্পদ এক বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত নয়; বরং কুরবানির দিনগুলোতে থাকলেই হবে।
- সোনা-রূপা বা ব্যবসার পণ্য ছাড়াও অতিরিক্ত আসবাবপত্র, জমি বা ব্যবহৃত গাড়ির অতিরিক্ত গাড়িও কুরবানির নিসাবে অন্তর্ভুক্ত হবে।
পরিবারের সদস্যদের কুরবানি
হানাফী মাজহাব অনুযায়ী, পরিবারের প্রতিটি সদস্য (স্বামী, স্ত্রী এবং প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান) যদি আলাদাভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে তাদের প্রত্যেকের ওপর আলাদাভাবে কুরবানি ওয়াজিব।
স্বামী যদি চান, তবে সামর্থ্যবান স্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে তার পক্ষ থেকে কুরবানি করতে পারেন, তবে এটি স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক নয়।
উপসংহার
পরিশেষে, কুরবানি কেবল পশু জবাইয়ের উৎসব নয়; এটি অন্তরের তাকওয়া ও খোদাভীতির পরীক্ষা।
"আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া" (সুরা হজ: ৩৭)।
তাই সামর্থ্যবানদের উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য খুশিমনে এই ইবাদত পালন করা।
