হেফজখানার ছাত্রদের পূর্ণাঙ্গ নসিহতনামা
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
১. নিয়ত ঠিক করো - পর্ব ১
আমলের আগে নিয়ত ঠিক করা ফরজ। নিয়ত ঠিক না থাকলে ৩০ পারা মুখস্থ করলেও কোনো ফায়দা হবে না।
৩টি নিয়ত করবে:
- ১. আল্লাহর জন্য: শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পড়ছি। মানুষ হাফেজ বলবে, সম্মান করবে — এই নিয়ত থাকলে হেফজ জাহান্নামের কারণ হবে।
- ২. বাবা-মায়ের জন্য: কিয়ামতের দিন বাবা-মাকে নূরের তাজ পরানো হবে, যার আলো সূর্যের চেয়েও বেশি।
- ৩. উম্মতের জন্য: উম্মতকে কুরআন শোনাবো, মসজিদে তারাবি পড়াবো।
প্রতিদিন সকালে সবক নেওয়ার আগে মনে মনে বলবে — "ইয়া আল্লাহ, আমি আপনার জন্য পড়ছি, কবুল করুন।"
২. দৈনন্দিন রুটিন - ভোর থেকে দুপুর
হেফজের মূল চাবিকাঠি হলো রুটিন। যে রুটিন মানে, সে সহজে হাফেজ হয়।
- ৪:৩০ — তাহাজ্জুদ: ঠান্ডা পানিতে ওযু করে ২ বা ৪ রাকাত তাহাজ্জুদ পড়বে। তাহাজ্জুদে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করবে — "আল্লাহ, আমার হেফজ সহজ করে দিন।"
- ৫:০০ — ফজর: জামাতে নামাজ পড়বে। নামাজের পর হাত তুলে দোয়া। তারপর সূরা ইয়াসিন পড়বে। ফজরের পর নতুন সবক মুখস্থ করবে। এই সময় মাথা সবচেয়ে ফ্রেশ থাকে।
- ৭:০০ — সাতসবক: নাস্তার পর গত ৭ দিনের পড়া ওস্তাদকে শোনাবে। সাতসবক কাঁচা হলে পুরো হেফজ দুর্বল হয়ে যাবে।
- ১০:০০ — দাওর (পিছনের পড়া): এক পারা করে দাওর করবে। নিজে নিজে পড়বে, না দেখে।
৩. পড়া মুখস্থ করার নিয়ম - পর্ব ১
মুখস্থ করার জন্য বিশেষ নিয়ম মানতে হয়:
- নিয়ম ১: ওযু করে বসবে। ওযু ছাড়া মুখস্থ হয় না, বরকত থাকে না।
- নিয়ম ২: আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ পড়ে শুরু করবে। পড়ার শুরুতে ৩ বার পড়বে — "রব্বি যিদনী ইলমা" (হে আল্লাহ, আমার জ্ঞান বাড়িয়ে দিন)।
- নিয়ম ৩: এক আয়াত ১০ বার দেখে পড়বে, তারপর ১০ বার না দেখে পড়বে। মুখস্থ হলে পরের আয়াতে যাবে। তাড়াহুড়ো করবে না।
- নিয়ম ৪: আওয়াজ দিয়ে পড়বে। এতটুকু আওয়াজ যেন নিজের কানে শোনা যায়। মনে মনে পড়লে মুখস্থ পাকা হয় না।
৪. আদব - কুরআনের আদব
আদব ছাড়া ইলম আসে না। বেয়াদব কখনো হাফেজ হতে পারে না।
- ১. ওযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করবে না। ওযু ছুটে গেলে সাথে সাথে ওযু করে নিবে।
- ২. কুরআন সবসময় বুকের কাছে রাখবে। কখনো পেটের নিচে বা পিছনে রাখবে না। পড়ার সময় পা কুরআনের দিকে ছড়াবে না।
- ৩. কুরআনের উপর অন্য কোনো কিতাব, খাতা বা কলম রাখবে না। কুরআন সবসময় সবার উপরে থাকবে।
- ৪. কুরআন খুলে রেখে কোথাও যাবে না। বন্ধ করে রাখবে।
- ৫. কুরআন ডান হাতে নিবে, ডান হাতে রাখবে।
- ছেঁড়া পাতা: কুরআনের কোনো পাতা ছিঁড়ে গেলে সাবধানে তুলে রাখবে। পরে পুড়িয়ে ছাই পানিতে ভাসিয়ে দিবে। পায়ে যেন না পড়ে।
৫. আদব - মাদ্রাসার আদব
মাদ্রাসা হলো আল্লাহর ঘর। এখানে আদব বজায় রাখা ফরজ।
- ১. বিছানা গুছিয়ে রাখবে: ঘুম থেকে উঠে নিজের বিছানা সুন্দর করে গুছিয়ে রাখবে। অগোছালো বিছানায় রহমতের ফেরেশতা আসে না।
- ২. বাথরুম পরিষ্কার: বাথরুম ব্যবহারের পর ভালো করে পানি ঢালবে। নোংরা করে রাখবে না।
- ৩. অন্যের জিনিস না ধরা: অনুমতি ছাড়া সহপাঠীর লোটা, গামছা, সাবান, তেল ব্যবহার করবে না। এটা গুনাহ।
- ৪. মাদ্রাসায় দৌড়াদৌড়ি ও চিৎকার না করা: আস্তে কথা বলবে, আস্তে হাঁটবে। মাদ্রাসার পরিবেশ শান্ত রাখবে।
- ৫. মেহমান এলে সম্মান: মাদ্রাসায় কোনো মেহমান বা মুরুব্বি এলে সালাম দিবে, দাঁড়িয়ে সম্মান করবে, বসার জায়গা দিবে।
৬. আদব - ওস্তাদের আদব
ওস্তাদের আদব সবচেয়ে বড় আদব। ওস্তাদের দোয়া ছাড়া কেউ হাফেজ হতে পারে না। ওস্তাদ তোমাকে জান্নাতের রাস্তা দেখাচ্ছেন।
- ১. ওস্তাদের সামনে নিচু স্বরে কথা বলবে। কখনো মুখে মুখে তর্ক করবে না। ওস্তাদ ডাকলে বলবে — "জি হুজুর।"
- ২. ওস্তাদ বসতে বললে বসবে, দাঁড়াতে বললে দাঁড়াবে। ওস্তাদের দিকে পা ছড়িয়ে বসবে না।
- ৩. ওস্তাদের জুতা সোজা করে দেওয়া, ওস্তাদের খেদমত করা বড় সৌভাগ্যের বিষয়।
- ৪. ওস্তাদ বকা দিলে বা মারলে মনে কষ্ট নিবে না। ভাববে — ওস্তাদ আমাকে ভালোবেসে সংশোধন করছেন। ওস্তাদের বকা দোয়া সমান।
- ৫. ওস্তাদের বদদোয়া থেকে বাঁচবে। ওস্তাদ অসন্তুষ্ট হলে সারা জীবন চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায় না।
প্রতিদিন সকালে ওস্তাদের কাছে যেয়ে বলবে — "হুজুর, আমার জন্য দোয়া করবেন।"
৭. নামাজ ও আমল - পর্ব ১
হাফেজের প্রথম পরিচয় — সে নামাজি। যে নামাজ পড়ে না, সে কুরআন বুকে ধারণ করতে পারে না।
৫ ওয়াক্ত নামাজ:
- ১. আজান শুনলেই কিতাব বন্ধ করবে। ওযু করে মসজিদে চলে যাবে।
- ২. জামাতের সাথে নামাজ পড়বে। প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে।
- ৩. নামাজের পর সাথে সাথে উঠবে না। কিছুক্ষণ বসে জিকির ও দোয়া করবে।
প্রতিদিনের বিশেষ আমল:
- ফজরের পর: সূরা ইয়াসিন + ১০০ বার "সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি"।
- যোহরের পর: ১০ বার দরুদ শরীফ।
- আসরের পর: ১০০ বার "আস্তাগফিরুল্লাহ"।
৮. বাবা-মায়ের খেদমত - পর্ব ২
- ৪. পায়ে ধরে দোয়া নেওয়া: বাড়ি থেকে আসার সময় মা-বাবার পায়ে ধরে বলবে — "আমার জন্য দোয়া করবেন, আমি যেন হাফেজ হতে পারি।" মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত। মায়ের দোয়া আল্লাহ ফেরত দেন না।
- ৫. টাকা চাওয়া নয়: বারবার টাকা চেয়ে বাবাকে কষ্ট দিবে না। যা দিয়েছে, তাতে শুকরিয়া করবে। বাবা গরিব হলে বুঝবে।
- ৬. ফোনে কথা: মাদ্রাসা থেকে সপ্তাহে একবার মাকে ফোন দিবে। বেশি কথা নয়, ২ মিনিট — "আম্মা ভালো আছেন? আমার জন্য দোয়া করবেন।" মা সারাদিন খুশি থাকবে।
একটা ঘটনা: এক ছাত্র বাড়ি গিয়ে মায়ের পা টিপে দিচ্ছিল। মা বলল — "তুই হাফেজ হচ্ছিস, তুই কেন পা টিপবি?" ছেলে বলল — "আম্মা, আমি হাফেজ হচ্ছি আপনার পায়ের নিচে জান্নাত পাওয়ার জন্য।"
এমন ছেলের হেফজ আল্লাহ কবুল না করে পারেন?
৯. সাথীদের সাথে আচরণ - পর্ব ১
মাদ্রাসায় তোমার সাথীরা তোমার দ্বীনি ভাই। এরাই তোমার জীবনের সাথী। ৩০ বছর পর এরাই বড় বড় মসজিদের ইমাম হবে, মাদ্রাসার মোহতামিম হবে।
- ১. হিংসা না করা: কারো পড়া ভালো হলে হিংসা করবে না। বলবে — "মাশাআল্লাহ, আল্লাহ তোমার পড়ায় বরকত দিক।" হিংসা করলে নিজের পড়া নষ্ট হয়ে যায়। হিংসা হলো আগুন, নেক আমলকে জ্বালিয়ে দেয়।
- ২. গালি না দেওয়া: মুখে কখনো গালি আনবে না। হাফেজের মুখ থেকে গালি বের হলে ফেরেশতারা কষ্ট পায়। রাগ উঠলে "আউযুবিল্লাহ" পড়বে, ওযু করবে।
- ৩. মারামারি না করা: হাত দিয়ে কাউকে মারবে না। হাত দিয়ে কুরআন ধরো, মানুষকে মারার জন্য নয়। একবার মারামারি করলে উস্তাদের নজর থেকে পড়ে যাবে।
১০. খাওয়া ঘুম পরিষ্কার - পর্ব ১
হাফেজের শরীরও পবিত্র রাখতে হয়।
খাওয়া:
- ১. বিসমিল্লাহ বলে ডান হাতে খাওয়া। বাম হাতে শয়তান খায়।
- ২. পেটের ১ ভাগ খাবার, ১ ভাগ পানি, ১ ভাগ খালি রাখা। পেট ভরে খেলে পড়া মনে থাকে না, ঘুম বেশি আসে। বুযুর্গরা বলেন, "কম খাও, কম ঘুমাও, বেশি পড়ো।"
- ৩. খাবারের দোষ না ধরা: মাদ্রাসার খাবার যেমনই হোক, আলহামদুলিল্লাহ বলবে। দোষ ধরলে বরকত চলে যায়।
ঘুম:
- ১. এশার পর না জাগা। এশার পর গল্প করলে ফজরে উঠতে পারবে না।
- ২. ডান কাতে ঘুমানো সুন্নত।
- ৩. ঘুমানোর আগে ওযু, ৩ কুল, আয়াতুল কুরসি।
অনেক ছাত্র রাত ১২টা পর্যন্ত জাগে, তারপর ফজরে উঠতে পারে না। এটা শয়তানের ধোঁকা।
১১. খাওয়া ঘুম পরিষ্কার - পর্ব ২
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।
- ১. মেসওয়াক: দিনে ৫ বার মেসওয়াক। মেসওয়াক করলে মুখের দুর্গন্ধ যায়, ফেরেশতারা খুশি হয়, মৃত্যুর সময় কালিমা নসিব হয়।
- ২. জামা পরিষ্কার: জামায় ময়লা রাখবে না। সপ্তাহে ২ বার জামা ধুবে। ছেঁড়া জামা হলেও পরিষ্কার রাখবে। পরিষ্কার জামা দেখলে মানুষ কুরআনকে সম্মান করে।
- ৩. নখ কাটা: প্রতি শুক্রবার নখ কাটা সুন্নত। নখের মধ্যে শয়তান থাকে। লম্বা নখ রাখলে ওযু হয় না।
- ৪. মাথা আঁচড়ানো: প্রতিদিন মাথা আঁচড়াবে, তেল দিবে। এলোমেলো চুল রাখবে না।
- ৫. বিছানা ঝাড়া: রোজ সকালে বিছানা ঝেড়ে গুছিয়ে রাখবে। বিছানায় খাবার খাবে না।
রাসূল সা. সবসময় পরিষ্কার থাকতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তুমিও আতর ব্যবহার করবে।
১২. সারাজীবন কিভাবে চলবে - পর্ব ১
হেফজ শেষ হলেই শেষ নয়, শুরু। সারাজীবন কিভাবে চলবে, এখন থেকেই ঠিক করো।
- ১. সত্য কথা: সবসময় সত্য বলবে, মিথ্যা বলবে না। মিথ্যা বললে হাফেজের নূর চলে যায়। একটা মিথ্যা ঢাকতে ১০টা মিথ্যা বলতে হয়। তাই শুরু থেকেই সত্য বলা অভ্যাস করো।
- ২. আমানত: কেউ কিছু আমানত রাখলে খেয়ানত করবে না। টাকা, কিতাব, জামা — যা আমানত রাখবে, ঠিকভাবে ফেরত দিবে। হাফেজ মানে আমানতদার।
- ৩. ওয়াদা রক্ষা: ওয়াদা করলে রক্ষা করবে। "কাল দিবো" বলে ঘুরাবে না। মুমিনের আলামত — ওয়াদা রক্ষা করা।
- ৪. ছোটদের আদর, বড়দের সম্মান: ছোটকে দেখলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে, বড়কে দেখলে সালাম দিয়ে সম্মান করবে। রাসূল সা. বলেন, "যে ছোটকে স্নেহ করে না, বড়কে সম্মান করে না, সে আমার উম্মত নয়।"
১৩. সারাজীবন কিভাবে চলবে - পর্ব ২
- ৫. মোবাইল, টিভি, গান থেকে দূরে: এই তিনটা জিনিস হাফেজের সবচেয়ে বড় শত্রু। মোবাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করলে হেফজ ভুলে যাবে। টিভি দেখলে চোখ নষ্ট, দিল নষ্ট। গান শুনলে কুরআন বের হয়ে যায়। তাই মোবাইল যদি লাগেও, শুধু দরকারে ব্যবহার করবে, অযথা নয়।
- ৬. রাগ নিয়ন্ত্রণ: রাগ উঠলে সাথে সাথে ওযু করবে। দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়বে, বসে থাকলে শুয়ে পড়বে। রাগের সময় কোনো সিদ্ধান্ত নিবে না। রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে।
- ৭. মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার: রাস্তায় কারো সাথে ঝগড়া করবে না, কাউকে কষ্ট দিবে না। হাফেজের ব্যবহার দেখে মানুষ ইসলামকে চিনবে।
- ৮. প্রতিদিন কুরআন তেলাওয়াত: হেফজ শেষ হলেও প্রতিদিন কমপক্ষে ১ পারা তেলাওয়াত করবে, না দেখে নয়, দেখে। তেলাওয়াত ছাড়া ইয়াদ থাকে না।
১৪. ওস্তাদের প্রতি নসিহত - পর্ব ২
- ছাত্রদের খোঁজ রাখা: কে অসুস্থ, কার বাড়ি থেকে টাকা আসেনি, কে মন খারাপ করে আছে — খোঁজ রাখুন। একটু খোঁজ নিলে ছাত্ররা আপনাকে বাবার মতো ভালোবাসবে।
- নিজে আমল করা: আপনি যা বলবেন, নিজে তা করবেন। আপনি যদি তাহাজ্জুদ পড়েন, ছাত্ররাও পড়বে। আপনি যদি ফোনে সময় নষ্ট করেন, ছাত্ররাও করবে।
- দোয়া করা: প্রত্যেক ছাত্রের নাম ধরে ধরে দোয়া করুন — "ইয়া আল্লাহ, অমুককে হাফেজে কামেল বানিয়ে দিন।" উস্তাদের দোয়া আল্লাহ ফেরত দেন না।
- মনে রাখবেন: এই ছাত্ররাই কাল হাশরে আপনার জন্য সুপারিশ করবে — "ইয়া আল্লাহ, আমার উস্তাদ আমাকে কুরআন শিখিয়েছেন।"
তাই তাদেরকে নিজের সন্তানের মতো লালন করুন। কঠোর হোন, কিন্তু কঠোরতার ভিতরে মহব্বত রাখুন। লাঠির সাথে মিষ্টিও রাখুন।
